মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি
মুন্সিগঞ্জ—ঢাকার উপকণ্ঠের এ জনপদ একসময় শান্তিপূর্ণ এলাকাই ছিল। তবে গত এক বছরে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে সম্পূর্ণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে চলতি ২৬ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত ডাকাতি, ছিনতাই, চুরি ও হত্যার একের পর এক ঘটনা জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘটতে থাকে। এতে সাধারণ মানুষের মনে ভয়, আতঙ্ক ও ক্ষোভ দানা বেঁধেছে।
গত বছরের ২৩ অক্টোবর সিরাজদিখান উপজেলার মোরিচা এলাকায় ঢাকা–দোহার সড়কে এক যাত্রীবাহী বাসে পুলিশ পরিচয়ে সংঘবদ্ধ ডাকাতদল স্বর্ণ ব্যবসায়ী রামপ্রসাদ হালদারের কাছ থেকে সাত লাখ টাকা ও তিন ভরি স্বর্ণালঙ্কার লুট করে।
ঘটনাটি আলোড়ন তোলে পুরো জেলায়। পরে পুলিশের অভিযানে মাত্র ১২ দিনের মধ্যে ডাকাত দলের সাতজনকে গ্রেফতার করা হয় এবং উদ্ধার হয় লুট হওয়া গয়না ও ব্যবহৃত মোটরসাইকেল।
মুন্সিগঞ্জের অপরাধ চক্রের সঙ্গে সবচেয়ে আলোচিত নাম ছিল বাবলা ওরফে উজ্জ্বল। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মেঘনা নদীপথে ডাকাতি এবং অবৈধ বালু ব্যবসার নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন।
গত বছরের ২২ অক্টোবর রাতে গজারিয়ার মল্লিকের চর এলাকায় এক বন্দুকযুদ্ধে বাবলা নিহত হন। প্রতিপক্ষ চক্রের গুলিতে তিনি মারা যান বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা। তার মৃত্যুতে এলাকায় স্বস্তি ফিরলেও পরবর্তী মাসগুলোতে নতুন নতুন চক্র মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইকারীরা সক্রিয় থেকে যাচ্ছে। সম্প্রতি পুলিশের অভিযানে ইজিবাইক ছিনতাইকারী একটি সংঘবদ্ধ দলের সাত সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে রাতের বেলায় ইজিবাইক চালকদের টার্গেট করে ছিনতাই চালাচ্ছিল।
তবে সবচেয়ে দুঃসাহসী ঘটনা ঘটেছে চলতি মাসে। ২৫ আগস্ট ২০২৫ রাতে গজারিয়ার জামালপুর এলাকায় নবগঠিত পুলিশ ক্যাম্পে অন্তত ৫০–৬০ জন ডাকাত ট্রলারযোগে হামলা চালায়।
আধাঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এ সংঘর্ষে ডাকাতরা ককটেল ও গুলি চালায়। পুলিশ পাল্টা গুলি ছুড়ে অন্তত ২৪ রাউন্ড শেল নিক্ষেপ করে। পরে ডাকাতরা চাঁদপুরমুখী নদীপথে পালিয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ডাকাতরা এত বড় দুঃসাহস দেখাতে পারছে কারণ তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ও অস্ত্রের মজুদ রয়েছে। এ ধরনের হামলা পুলিশের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
একাধিক এলাকাবাসী জানান, সন্ধ্যার পর থেকে রাস্তায় চলাফেরা করতে ভয় পাচ্ছেন তাঁরা। বিশেষ করে নদীপথে ট্রলারযোগে যাতায়াতকারীরা সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে রয়েছেন। ব্যবসায়ীরাও ভোগান্তিতে—স্বর্ণ, নগদ অর্থ কিংবা পণ্য পরিবহন করতে হলে নিরাপত্তা নিয়ে দ্বিগুণ চিন্তায় পড়তে হচ্ছে।
মুন্সিগঞ্জ জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “অপরাধীদের দমনে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। কয়েকটি বড় ডাকাত চক্রকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে নদীপথের অপরাধ মোকাবেলায় আরো সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার।”
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিয়মিত টহল, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত না করলে এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। বিশেষ করে নদীপথে নজরদারি বাড়াতে ড্রোন, আধুনিক ট্রলার ও রাডার ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে।
গত এক বছরে মুন্সিগঞ্জে সংঘটিত একের পর এক ডাকাতি, ছিনতাই ও হত্যার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। পুলিশ কয়েকটি বড় চক্র ধরতে সক্ষম হলেও অপরাধের মাত্রা কমেনি।
বরং নতুন নতুন কৌশলে সংঘবদ্ধ অপরাধীরা নিজেদের সক্রিয় রাখছে। ফলে স্থানীয় মানুষ বলছেন, “নিরাপত্তাহীনতার ভয় নিয়ে আমরা আর বাঁচতে চাই না—প্রশাসনকে আরও শক্ত হাতে ব্যবস্থা নিতে হবে।”