ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সব ধরনের ছাত্ররাজনীতি—প্রকাশ্য কিংবা গোপন—নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান। এই ঘোষণাটি এসেছে ছাত্রদের দাবির মুখে, মধ্যরাতের প্রবল বিক্ষোভের পর, যখন গোটা ক্যাম্পাস উত্তাল হয়ে ওঠে ছাত্রদলের বিতর্কিত হল কমিটি ঘিরে।
ছাত্ররাজনীতির নামে হলে সংগঠনবাজির বাড়াবাড়ি, নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাদের ফিরিয়ে আনা এবং নির্যাতনের ইতিহাসে জড়িতদের পদায়ন—এই সবকিছুর বিরুদ্ধে এক হয়ে রাজপথে নেমে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে রোকেয়া হলের শিক্ষার্থীরা প্রতীকী বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। ছাত্রদল কর্তৃক ১৮টি হলে গোপনে আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা মাত্রই শুরু হয় সমালোচনার ঝড়।
বিকেল থেকে সন্ধ্যা অবধি রোকেয়া হলসহ পাঁচটি নারী হলের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করতে থাকেন। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেন—ছাত্ররাজনীতির নামে ঘৃণ্য পুনর্বাসন তারা মানে না। রাত ১২টা পর্যন্ত হল প্রশাসন কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় রোকেয়া হলের ছাত্রীরা গেটের তালা ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসেন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, জসীম উদ্দিন হল, শেখ মুজিব হল, বিজয় একাত্তর হল, মুহসীন হল, সার্জেন্ট জহুরুল হক হল এবং মাস্টারদা সূর্য সেন হল থেকে প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে জড়ো হন রাজু ভাস্কর্যে। তাদের স্লোগানে গর্জে উঠে ছাত্রসমাজ—‘হল পলিটিক্সের বিরুদ্ধে ডাইরেক্ট একশন’, ‘কমিটি দিছিস হল ছাড়’, ‘জেগেছে রে জেগেছে ছাত্র সমাজ জেগেছে’।
রাত ১টা ২০ মিনিটে তারা উপাচার্য নিয়াজ আহমদের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। চূড়ান্ত জনরোষের মুখে শেষ পর্যন্ত উপাচার্য ঘোষণা দেন—ঢাবির সব হলে প্রকাশ্য ও গুপ্ত রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
এই সিদ্ধান্ত এক অর্থে শিক্ষার্থীদের বিজয়। তারা দেখিয়ে দিয়েছে—রাজনীতির নামে গেস্টরুম, গ্যাং কালচার, লেজুড়বৃত্তি আর অনুপ্রবেশ বন্ধে তারাই চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক। ১৭ জুলাই ২০২3-এ যে রাজনীতিমুক্ত হলের স্বপ্ন তারা দেখেছিল, আজকের মধ্যরাতের উত্তালতা তারই চূড়ান্ত রূপ।
এই ঘোষণা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নয়—পুরো দেশের ছাত্ররাজনীতির পটপরিবর্তনের জন্যও এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। প্রশ্ন উঠেছে, এর পর ছাত্রসংগঠনগুলো কী পথে হাঁটবে? গোপন রাজনীতি কী রূপ নেবে? আর প্রশাসন কিভাবে বাস্তবায়ন করবে এই নিষেধাজ্ঞা?
একটি বিষয় নিশ্চিত—ছাত্রদের রক্তে আগুন জ্বলেছে। তারা জেগেছে। এখন প্রশ্ন একটাই, প্রশাসন কি সেই আগুনে ঘি ঢালবে, নাকি সুশৃঙ্খলতা প্রতিষ্ঠার পথ বেছে নেবে?