আবু তাহের,ক্যাম্পাস সংবাদদাতা, জাককানইবি
গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রক্সি জালিয়াতির ঘটনায় জড়িত তিনজনকে আটক করেছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় (জাককানইবি) প্রশাসন।
আটককৃতরা হলেন—ত্রিশালের ওবায়েত হাসান আফিক, মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান থানার পনির উদ্দিন খান পাভেল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের শিক্ষার্থী সালমান ফারদিন সাজিদ সিয়াম।
ঘটনাটি প্রকাশ পায় বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে চূড়ান্ত ভর্তি প্রক্রিয়ার সময়। সেদিন চরপাড়া, ত্রিশাল উপজেলার বাসিন্দা ওবায়েত হাসান আফিক (গুচ্ছ রোল: ২০১৬৯৭) ভাইভা বোর্ডে নিজের স্বাক্ষর মিলিয়ে দিতে ব্যর্থ হন, প্রবেশপত্রের ছবির সঙ্গে তার চেহারার অমিল দেখা যায় এবং বিজ্ঞান বিভাগের সাধারণ প্রশ্নের জবাবও দিতে না পারায় শিক্ষকদের সন্দেহ হয়।
পরে অভিভাবক পরিচয়ে পাভেল নামে একজনকে নিয়ে আসেন আফিক। কথাবার্তায় অসঙ্গতি ধরা পড়লে শিক্ষকেরা আফিকের মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে পাভেলের সঙ্গে ভর্তির লেনদেন এবং স্বাক্ষর সংক্রান্ত হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা পান।
পাভেলের আইফোন পরীক্ষা করে সেখানে পিএসসি, বিসিএস, বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার ও গুচ্ছভুক্ত ভর্তি পরীক্ষার চার-পাঁচশো এডমিট কার্ড ও প্রার্থীদের ছবি পাওয়া যায়। এমন সময় একটি ফোনকল আসার পর ফোনটি লক হয়ে যায়। প্রায় ৪-৫ ঘণ্টা জেরার পরেও পাভেল ফোনটির লক খুলতে অস্বীকৃতি জানান। পরে আফিক স্বীকার করেন, তিনি প্রক্সির মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন।
এ সময় পাভেলের ফোনে ‘সিয়াম’ নামের একজনের কল আসে। অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, “ভর্তির কী অবস্থা ভাই?” এ তথ্য পেয়ে শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাটাবেস থেকে সিয়ামের নম্বর শনাক্ত করেন। দেখা যায়, তিনি ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে আইন ও বিচার বিভাগের শিক্ষার্থী সালমান ফারদিন সাজিদ সিয়াম।
তারপর সিয়ামকে নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তিনি ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে লোক প্রশাসন ও সরকার পরিচালনাবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী কৌশিক কুমার চন্দের (গুচ্ছ রোল: ২০৪৩৯৩) হয়ে পরীক্ষা দিয়েছিলেন। এজন্য পাভেল তাকে প্রায় এক লক্ষ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় সিয়ামের ফোনে শান্ত ভূইয়া নামে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের এক শিক্ষার্থীর কল আসে। সিয়াম জানান, শান্তর মাধ্যমেই পাভেলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।
তদন্তে আরও উঠে আসে, সিয়ামের ফোনে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সদ্য ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী পুনিয়া দে মৃদুর ওএমআর শিটের ছবি পাওয়া গেছে।
পাভেল স্বীকার করেন, তিনি ‘বাবু’ নামে এক ব্যক্তির নির্দেশে এসব কাজ করেন এবং বাবুই ভর্তির পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করেন। এমনকি কৌশিককে ভর্তি করানোর জন্য বাবু সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলেন বলেও জানান।
এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি, ওবায়েত হাসান আফিকের হয়ে প্রকৃতপক্ষে কে পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তবে নিশ্চিতভাবে জানা গেছে, আফিক ও কৌশিক উভয়ের প্রক্সি পরীক্ষা জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
ঘটনার পর গুচ্ছভুক্ত ভর্তি পরীক্ষার নিরাপত্তা, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরীক্ষাকেন্দ্রে স্বচ্ছতার অভাব এবং জামালপুর কেন্দ্রকে ঘিরে সক্রিয় জালিয়াতি চক্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান বলেন,
“এ চক্রের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিমধ্যেই আরও একজন ভর্তি হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে। আটক তিনজনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুরো ঘটনায় তদন্তের জন্য পাঁচ-ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা আগামী রবিবার প্রকাশ করা হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন,
“ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে রবিবার তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে পুরো চক্রের সন্ধান বের করার চেষ্টা চলছে। ঘটনাটি জামালপুরে ঘটলেও, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সবার স্বতঃস্ফূর্ত চেষ্টায় তা ধরা পড়েছে। তদন্ত করলে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসবে।”
ত্রিশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনসুর আহম্মদ বলেন,
“বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। আজ শুক্রবার আটককৃতদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।”
শিক্ষার্থীরা দাবি জানিয়েছেন, তদন্তের মাধ্যমে পুরো জালিয়াতি চক্রকে চিহ্নিত করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনতে হবে।