৫ আগস্ট—এই দিন আজ আর কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, এটি এখন বাংলাদেশের ইতিহাসে গণজাগরণের প্রতীক, ত্যাগ আর বিজয়ের অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনেই স্বৈরাচারী আওয়ামী শাসনের পঁচা শেকড় উপড়ে ফেলে ছাত্র-জনতা একসঙ্গে লিখেছিল নতুন বাংলাদেশের সূচনা।
২০২৪ সালের এই দিনেই রক্ত দিয়ে রাজপথ ফিরিয়ে নেয়া ছাত্র-জনতা আর সাধারণ মানুষ বেলা ৩টায় আর সেনাপ্রধানের ভাষণের অপেক্ষা করেনি। ব্যানার ছাড়াই, মাইক্রোফোন ছাড়াই মানুষের ঢল নেমেছিল রাজপথে—সাদা চুলের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে শিশু-কিশোর পর্যন্ত সবার মুখে একই স্লোগান—“বাংলাদেশ! বাংলাদেশ!”
এই আন্দোলনের সূচনা হয় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলন দিয়ে। ‘কোটা না মেধা—মেধা চাই’ স্লোগান থেকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। আন্দোলনের মাঝেই রংপুরে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে আবু সাঈদকে। চট্টগ্রামে শহীদ হন ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম। শুরু হয় এক দফার আন্দোলন—“হাসিনা তুই কবে যাবি!”
সরকারের গদি টলে উঠতে থাকে। ৩ আগস্ট শেখ হাসিনা আলোচনার নামে ধোঁকা দিতে চাইলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। সেদিন শহীদ মিনারে লাখো মানুষের সামনে নাহিদ ইসলাম ঘোষণা করেন, “সরকার পতনের এক দফা।” সমাবেশ থেকে দেওয়া হয় ১৫ দফা অসহযোগের নির্দেশনা।
একইদিন বিকেলে সেনা সদরেও পাল্টে যায় আবহাওয়া। জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের ‘অফিসার্স অ্যাড্রেস’-এ সেনা কর্মকর্তারা সরাসরি বলেন,
“আমরা জনগণের বুকে গুলি চালাতে পারি না।” সেনাপ্রধানও সাফ জানিয়ে দেন, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জনগণের পাশে আছে এবং থাকবে।”
পরদিন ৪ আগস্ট দেশজুড়ে শহীদদের মিছিলে যোগ হয় আরও নাম। আন্দোলন আরও বেগবান হয়। এরপরেই আসে ৫ আগস্ট—চূড়ান্ত মুক্তির দিন। সকাল থেকেই রাজধানীর পথে পথে ব্যারিকেড, সেনা, র্যাব, পুলিশ দাঁড় করিয়ে আন্দোলন ঠেকাতে চায় সরকার। কিন্তু ব্যর্থ হয়।
বেলা ১১টার আগেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে খবর—শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছেন। শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে ত্রিপুরা হয়ে দিল্লি পালিয়েছেন তিনি। ইন্টারনেট চালু হতেই দেশের আকাশ-বাতাস গর্জে ওঠে,
“পলাইছে রে পলাইছে, শেখ হাসিনা পলাইছে!”
লাখো জনতা গড়ায় গণভবনের দিকে, সেখানে তুলে ধরা হয় লাল-সবুজ পতাকা। শুরু হয় আনন্দ, শুরু হয় উৎসব, শুরু হয় নতুন বাংলাদেশের সূচনা।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশ্যে শুভেচ্ছা বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি বলেন,
“বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ফ্যাসিবাদী অপশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলে ২০২৪ সালের এই দিনে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।”
প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস বলেন,
“জুলাই আমাদের নতুন করে আশার আলো—একটি ন্যায় ও সাম্যভিত্তিক, বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে।”
৫ আগস্ট কেবল সরকারের পতনের দিন নয়, এটি এক নতুন ইতিহাসের সূচনা। এই দিনে মানুষ দেখেছে—যখন ছাত্র-জনতা জেগে ওঠে, তখন আর কোনো অস্ত্র, কোনো তোষামোদি ক্ষমতা, কোনো মিডিয়া প্রোপাগান্ডা চলতে পারে না।