সাবেক সেনাপ্রধান, বীরপ্রতীক, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) এম হারুন-অর-রশিদ জীবনাবসানের পর তাঁর রেখে যাওয়া শেষ তিনটি ইচ্ছা বাস্তবায়নের মাধ্যমে যেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন। এই মুক্তিযোদ্ধা শুধু যুদ্ধের ময়দানে সাহসিকতার প্রতীক নন, বরং মৃত্যুর আগেও রেখে গেছেন এক চমৎকার নৈতিক বার্তা—নাটকীয়তা নয়, রাষ্ট্রীয় জাঁকজমকের বাইরে থেকেও শ্রদ্ধা পাওয়া যায় যদি সম্মান অর্জিত হয় প্রকৃতভাবে।
গত সোমবার (৪ আগস্ট) বিকাল সাড়ে তিনটায় চট্টগ্রাম ক্লাবের গেস্ট হাউসের ৩০৮ নম্বর রুম থেকে তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার করে সেনাবাহিনীর একটি দল সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যায়। এরপর সেখান থেকে বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে প্রথম জানাজা শেষে মরদেহ তাঁর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাতে হাটহাজারীর নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর বাবার পাশে শেষ শয্যায় শায়িত হন তিনি।
কিন্তু এই বিদায় ছিল ব্যতিক্রম। কারণ, তাঁর স্পষ্ট নির্দেশ ছিল—
“রাষ্ট্রীয় সম্মান নয়, মানবিক মর্যাদা চাই।”
তিনি গার্ড অব অনার প্রত্যাখ্যান করেন। এমনকি চক্ষুদানের মত মহৎ দানও করেন মৃত্যুর আগে। সন্ধানী নামক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাছে তাঁর চোখ হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ডেসটিনির আর্থিক কেলেঙ্কারির একটি মামলায় হাজিরা দিতে রোববার তিনি চট্টগ্রাম আসেন। সোমবার সকাল পর্যন্ত কোনো সাড়া না পাওয়ায় কক্ষ খুলে দেখা যায়, এই বীরযোদ্ধা আর নেই। এই মৃত্যু শুধু একজন সাবেক সেনাপ্রধানের বিদায় নয়, বরং এক আদর্শিক বার্তার প্রচার—রাষ্ট্রীয় আয়োজন নয়, মানুষের সেবা, ন্যায়বিচার এবং আত্মত্যাগই আসল সম্মান।
তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল বাহারের কাছে হারুন-অর-রশিদ মাসখানেক আগে নিজের শেষ তিন ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর সেজো বোনের জামাতা ডা. জহির এই ইচ্ছাগুলো সাংবাদিকদের সামনে প্রকাশ করেন। তিনটি ইচ্ছা ছিল—
১. দাফনে যেন কোনো বিলম্ব না হয়,
২. পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর বাবার পাশে যেন দাফন করা হয়,
৩. কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় সম্মান বা গার্ড অব অনার যেন না দেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্ত ছিল এক ধাক্কা বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং সামরিক ঐতিহ্যের ঘুণে ধরা রেওয়াজে। যেখানে মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়াকে অনেকেই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ভাবেন, সেখানে এক সাবেক সেনাপ্রধান নিজের চেতনার ওপর দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রত্যাখ্যান করেছেন। এটি ছিল এক নির্লজ্জ কর্তৃত্ববাদের প্রতি মৌন প্রতিবাদ, এক উচ্চকিত বার্তা যে সম্মান চাপিয়ে দেওয়া যায় না—তা অর্জন করতে হয় আদর্শ দিয়ে।
মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। ২০০০ সালের ২৪ ডিসেম্বর থেকে ২০০২ সালের ১৬ জুন পর্যন্ত দেশের দশম সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এম হারুন-অর-রশিদ। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত হন।
এই মৃত্যুর খবরের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে একটি নীরব বিদ্রোহ—রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে নয়, জনগণের সম্মানই যেন চূড়ান্ত। আজ যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মোহে নিজেদের অতিরঞ্জিত করে তোলেন, এই মৃত্যু তাদের জন্য এক স্পষ্ট আয়না।