মজনুর রহমান আকাশ, মেহেরপুরঃ
কষ্টের মাঝেও পরম মমতায় ঘর বাঁধেন যে বাবা মা, এক সময়ে সন্তানের কারণে আপন নিবাস ছেড়ে যেতে হয় তাদের। নিজ ঘরে তখন তারা হয়ে ওঠেন পরবাসী। যে বয়সে নাতি নাতনি আর আপনজনদের সাথে হেসে খেলে একান্তে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সে কাটে তাদের প্রবীণ নিবাস বা বৃদ্ধাশ্রমের ছোট্ট কামরার বিছানায়। ঝাঁপসা চোখে আপনজনদের কথা ভেবে ভেবেই কাটে তাদের সময়।
ঢাকার রবার্ট রঞ্জিত হালদার। বার্ধক্যের কারণে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন অনেক আগেই। ধর্ণাঢ্য পরিবারের এই ব্যক্তিটিই ছিলেন একজন উচ্চ শিক্ষিত মানুষ। স্ত্রী মারা যান, আর একমাত্র মেয়ে গ্লোরিয়া লিপি হালদারের বিয়ের পরে চলে যান ফ্রান্সে।
দেখা শোনার কেউ না থাকায় তার ঠাই হয় মুজিবনগর বল্লভপুরের বৃদ্ধাশ্রমে। মেয়ে দিনে দুবার কল দেন। রাতে গুড নাইট আর সকালে গুড মর্নিং বলেন। অনেক আকুঁতি জানালেও মেয়ে কবে আসবে তার নির্দিষ্ট সময় বলেনা। শুধু বলে কোনো একদিন হঠাৎ এসে তোমাকে সারপ্রাইজ দেবে বাবা। সেই প্রতিক্ষায় দিন কাটে তার
শুধু রবার্ট রঞ্জিত হালদারই নয়, একই অবস্থা ৯০ বছর বয়সি এ্যাডমিন মনিময় সর্দার ও ৭৮ বছর বয়সি পল মিত্রের। বিয়ে না করায় জগতে আপন কেউ না থাকায় বৃদ্ধাশ্রমে টেলিভিশন দেখে সময় কাটাতে হয় ৯৫ বছর বয়সি শুসেন সরকারের।
তিনিও দিন কাটাচ্ছেন স্বজনদের আশায়। অথচ কেউ আসেনা তাদের খোঁজ খবর নিতে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এমন বাস্তব জীবনের মুখোমুখি হতে হবে কোনোদিন ভাবতেও পারেনি বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এসব বৃদ্ধরা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে,মুজিবনগরের বল্লভপুরের এই বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই হয়েছে ২৫ জনের । এদের মধ্যে ৭ জন পুরুষ ও ১৮ জন নারী। যাদের আপনজন থেকেও নেই,নেই মাথা গোঁজার ঠাই।
৯০ বছর বয়সি অ্যাডমিন মনিময় সর্দার জানান, তার মন চায় নাতি নাতনিদের সাথে খুনসুটি করতে। কিন্তু বিধি বাম। কানাডা প্রবাসী ছেলে তার সন্তানদের বৃদ্ধ দাদুর কাছে আসতে দেননা, সময় নেই তাদের।
আশ্রমের এসব বৃদ্ধরা নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। তারপরেও বৃদ্ধাশ্রমে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করছেন এসব বৃদ্ধরা। জৈষ্ঠ সেবিকা আন্না মন্ডল বলেন, পরিবারের চেয়ে এখানেই ভাল আছেন তারা।
তবুও স্বজনদের প্রতিক্ষার প্রহর গুনতে হয় তাদের। এটাই জগত সংসার,এটাই মায়া। নিজের দাদা,বাবাদের মতই আদর যত্ন আর খুনসুটি করেন প্রশিক্ষনার্থী সেবিকা প্রিয়া মন্ডল,পিউ মল্লিকসহ অনেকেই।
গাংনী মহিলা ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রমজান আলী জানান,মানুষ বৃদ্ধ হয়ে পড়লে শিশুর মত অসহায় হয়ে পড়ে। তখন পরিবার সন্তানদের সঙ্গ খুবই জরুরী। শেষ বয়সে পিতা মাতার এবমাত্র ভরসা সন্তান সন্ততি। প্রতিটি বাবা মায়ের জন্য পরিবারই হয়ে উঠুক সহায় আমরা এটাই প্রত্যাশা করি।