কাতারের রাজধানী দোহায় চলমান ‘আর্থনা সামিট ২০২৫’-এ অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বুধবার (২৩ এপ্রিল) সামিটের দ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে তিনি ‘বাধ্যতামূলকভাবে বাস্তুচ্যুত জনগণের সামাজিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ—রোহিঙ্গা ইস্যু’ শীর্ষক আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।
গোলটেবিল আলোচনায় ড. ইউনূস বলেন, “বাংলাদেশের ভূখণ্ডে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক ও পরিবেশগতভাবেও একটি স্থায়ী চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।” তিনি জানান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে কাতারের মতো প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোকে অবশ্যই মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
এই বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ এবং প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
এর আগে ড. ইউনূস সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে জলবায়ু পরিবর্তন ও দারিদ্র্য বিমোচন বিষয়েও বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, “দারিদ্র্য গরিব মানুষের সৃষ্টি নয়, বরং একটি ত্রুটিপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফল, যেখানে সম্পদ একটি ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়।” তিনি সামাজিক ব্যবসার ধারণা তুলে ধরে বলেন, “সবার জন্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা গেলে বৈশ্বিক দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব।”
সামিটে “Building Our Legacy: Sustainability, Innovation and Traditional Knowledge” শীর্ষক প্রতিপাদ্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। জলবায়ু অর্থনীতি, পরিবেশগত ন্যায্যতা, বাস্তুচ্যুতি, এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির প্রসারে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও উদ্ভাবনের কথাও তুলে ধরেন ড. ইউনূস।
সফরকালে তিনি কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও মানবিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন। এছাড়া কাতার ফাউন্ডেশন, কাতার চ্যারিটি এবং আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্কের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
আগামী ২৩–২৫ এপ্রিল মস্কোয় অনুষ্ঠেয় ইরান–রাশিয়া অর্থনৈতিক কমিশন বৈঠকের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সহযোগিতা নিয়েও কাতারে আঞ্চলিক পক্ষগুলোর সঙ্গে প্রাথমিক মতবিনিময় করেন ড. ইউনূস ও তার প্রতিনিধি দল।
প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গা সংকট বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম জটিল মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার অনেকে বছরের পর বছর শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আন্তর্জাতিক চাপ এবং অনুদান হ্রাসের প্রেক্ষাপটে সংকটটির স্থায়ী সমাধানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা বারবার উঠে আসছে।
আর্থনা সামিটে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণকে ইতিবাচক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই সম্মেলন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিবেশ ও মানবিক সংকট ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠেছে। ড. ইউনূসের উপস্থিতি ও বক্তব্য বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান ও প্রভাব আরও সুদৃঢ় করবে বলে আশা করা হচ্ছে।