বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে নতুন প্রজন্মের পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন তৈরি করছে চীন। দেশটির সামুদ্রিক শক্তি বৃদ্ধির এই উদ্যোগ শুধু আকার নয়, বরং প্রযুক্তিগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাবমেরিন তৈরিতে এখন যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে দেশটি।
চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি (প্ল্যান) দ্রুতগতিতে তাদের নৌবহর আধুনিকায়ন করছে। উন্নত জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সহায়তায় তারা নতুন যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন যুক্ত করছে বহরে। এই উন্নয়ন চীনের ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আরও এগিয়ে নিতে পারে।
সম্প্রতি প্রকাশিত স্যাটেলাইট চিত্রে চীনের সবচেয়ে বড় ও আধুনিক সাবমেরিন ‘টাইপ–০৯৫’-এর একটি ঝলক দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি আগের টাইপ–০৯৩বি ও টাইপ–০৯৪ শ্রেণির সাবমেরিনের উন্নত সংস্করণ।
যদিও এর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, টর্পেডো বিন্যাস ও সোনার সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো সীমিত পরিসরে সামনে এসেছে, তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে এটি যুক্তরাষ্ট্রের পানির নিচে আধিপত্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
উপগ্রহচিত্র অনুযায়ী, এই সাবমেরিনটির আকার বড় প্রায় ১১০ মিটার দীর্ঘ এবং এর অভ্যন্তরীণ ধারণক্ষমতা বেশি। এর স্থানচ্যুতি প্রায় ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার টনের মধ্যে হতে পারে, যা এটিকে চীনের বহরের সবচেয়ে বড় সাবমেরিনে পরিণত করতে পারে।
যদিও সাবমেরিনটির গঠন সম্পর্কে খুব কমই জানা গেছে। প্রাপ্ত প্রতিবেদনগুলো থেকে বোঝা যায়, টাইপ ০৯৫ পিএলএএন পানির নিচের সক্ষমতা উন্নত করবে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এই সাবমেরিনে উন্নত হাইড্রোডাইনামিক নকশা, উন্নত শব্দনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং অপেক্ষাকৃত নীরব প্রপালশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, যা শত্রুর শনাক্তকরণ এড়াতে সহায়ক হবে। এতে পাম্প-জেট প্রপেলার, শব্দ প্রতিরোধী আবরণ এবং উন্নত ইঞ্জিন কম্পন নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি থাকতে পারে।
এতে সম্ভবত উন্নত অ্যাকোস্টিক প্রযুক্তি, যেমন- সোনারকে বোকা বানানো অ্যানিকোয়িক টাইলস এবং উন্নত ইঞ্জিন ভাইব্রেশন আইসোলেশন সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত থাকায় কিছু বিশ্লেষক বিশ্বাস করেন, ০৯৫ বেইজিংয়ের কোলাহলপূর্ণ সাবমেরিনের সমস্যা কাটিয়ে উঠবে।
এছাড়া সাবমেরিনটিতে এক্স-আকৃতির রাডার ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে, যা পানির নিচে গতিশীলতা বাড়াবে। এতে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর থাকতে পারে, যা দীর্ঘ সময় পানির নিচে অভিযান পরিচালনায় সহায়তা করবে।
অস্ত্র ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নিশ্চিত তথ্য না থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে, এতে উল্লম্ব উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা থাকতে পারে, যার মাধ্যমে আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার সম্ভব। এই ব্যবস্থাটি বেইজিংয়ের নতুন ওয়াইজে-১৯ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র অথবা জাহাজ-বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ওয়াইজে-২০ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করতে সক্ষম, কিন্তু বিষয়টি এখনও অনিশ্চিত।
আরেকটি সম্ভাবনা হলো ট্রাই-প্যাক নামে পরিচিত একটি অস্ত্র ব্যবস্থা, যেখানে একটি টিউবের মধ্যে তিনটি উৎক্ষেপণ সেল থাকে। কেউ কেউ ধারণা করেছেন, টাইপ ০৯৫-এ আটটি টর্পেডো টিউব থাকবে, যার মধ্যে চারটি জাহাজের সামনের অংশের (বো) উভয় পাশে বসানো থাকবে, যা সম্ভবত একটি বড় সোনার সিস্টেমের জন্য জায়গা তৈরি করবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সাবমেরিন মূলত পানির নিচে যুদ্ধের জন্য ব্যবহার করা হবে, বিশেষ করে প্রতিপক্ষের পারমাণবিক সাবমেরিন মোকাবিলায়। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিউলফ সাবমেরিনের মতোই হবে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও এটি জাহাজ বা স্থলভাগে আঘাত হানার সক্ষমতাও রাখতে পারে, তবে এটিকে প্রধানত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সাবমেরিন হিসেবে ব্যবহার করা হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইতিহাসগতভাবে চীনের সাবমেরিন বহর প্রযুক্তি ও সংখ্যার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার তুলনায় পিছিয়ে ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্রে উন্নয়ন ঘটিয়ে চীন দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে বেইজিং।
২০২২ সাল নাগাদ যেখানে মাত্র ছয়টি পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরি করেছিল চীন, সেখানে ২০২২ সালের পর থেকে প্রতি বছর প্রায় তিনটি করে পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরি করছে তারা। মাত্র দুই দশকের কিছু বেশি সময়ে পিএলএএনকে বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনীতে পরিণত করেছে দেশটি।
একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীন প্রায় ৭৯ হাজার টন ডিসপ্লেসমেন্টের সাবমেরিন তৈরি করেছে, যেখানে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করেছে প্রায় ৫৫ হাজার টন। অর্থাৎ পারমাণবিক সাবমেরিন উৎপাদনে এখন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে বেইজিং।
এই উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে চীন এখন নৌবাহিনীকে নিজস্ব সীমার বাইরে বিস্তৃত করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে দেশটি। নতুন টাইপ–০৯৫ সাবমেরিনটি যুদ্ধজাহাজ বহর, বিমানবাহী রণতরী ও অন্যান্য আক্রমণাত্মক ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে পারবে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিন বাহিনী এখনো প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে, তবুও উৎপাদনের এই ব্যবধান ভবিষ্যতে সামরিক ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। বর্তমানে বোহাই শিপইয়ার্ডে নির্মাণাধীন এই সাবমেরিনটি আগামী এক বছরের মধ্যেই পানিতে নামানো হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র: বিজিআর
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?