যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলতি সপ্তাহে সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও বিশ্বজুড়ে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ থামার কোনও লক্ষণ নেই। বরং হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রমাণ করেছে যে, একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বা প্রযুক্তির দখল থাকলেই বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের সময় এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর বন্ধ করে দিয়ে ইরান বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়েছিল। মূলত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহকে ‘জিম্মি’ করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই ছিল তেহরানের লক্ষ্য।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বুধবার যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন এই শর্তে যে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে হবে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। তবে তেহরান ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে ‘টোল’ বা মাশুল আদায়ের ঘোষণা দিয়েছে, যা তাদের নিয়ন্ত্রণকে আরও পাকাপোক্ত করবে। মুক্ত জলপথের এই নতুন প্রতিবন্ধকতা যুক্তরাষ্ট্র বা এশীয় ও ইউরোপীয় দেশগুলো কতটা মেনে নেবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ইরানের এই পদক্ষেপ দেখিয়ে দিয়েছে যে, কেবল ভৌগোলিক অবস্থান এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ভাণ্ডার ব্যবহার করেই বড় অর্থনীতিগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘ক্ষমতা টেবিলে’ আসন পেতে হলে অন্য দেশকে নিজের সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে হয়। অন্যথায় সেই দেশ নিজেই অন্যের শিকারে পরিণত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দেখানো পথই অনুসরণ করছে। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে ডলার-ভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশ ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে।
অন্যদিকে চীন তাদের বিরল খনিজ সম্পদের (রেয়ার আর্থ) ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এমনকি জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির তাইওয়ান সংক্রান্ত মন্তব্যের জেরে চীন জাপানের খনিজ সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করেছে।
এই পরিস্থিতিকে বিশেষজ্ঞরা কৌশলগত অপরিহার্যতা হিসেবে বর্ণনা করছেন। টোকিওভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অব জিওইকোনমিকস-এর গবেষক অ্যান্ড্রু ক্যাপিস্ট্রানো বলেন, প্রতিরোধ গড়ার জন্য আপনাকে এটি বলার ক্ষমতা রাখতে হবে যে, ‘তোমরা আমাদের যা প্রয়োজন তা বন্ধ করলে, আমরাও তোমাদের প্রয়োজনীয় জিনিস বন্ধ করে দেব’।
অর্থনীতিবিদ পল শেয়ার্ডের মতে, বিশ্বায়নের স্বর্ণালী যুগে অর্থনীতিবিদরা নীতিনির্ধারণের চালকের আসনে থাকতেন। কিন্তু এখন সেই জায়গা দখল করেছেন জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মুক্ত বাণিজ্যের বদলে এই সংরক্ষণবাদ ও সন্দেহের রাজনীতি বিশ্বজুড়ে সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?