দীর্ঘ ১ বছর ৮ মাস ২৪ দিনের প্রতীক্ষা শেষে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাইদের হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ২০২৪ সালের সেই উত্তাল জুলাইয়ে আবু সাইদ ছিলেন ছাত্র-জনতার জাগরণের প্রথম স্পুলিঙ্গ। ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার স্বৈরাচারী শক্তি ভেবেছিল, লাশের স্তূপ সাজিয়ে ভয় ও আতঙ্কের চাদরে ছাত্রসমাজকে ঢেকে দেওয়া যাবে। তাই তো আন্দোলন দমাতে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো এক তরুণকে স্তব্ধ করে দিলো। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে, আবু সাইদের সেই রক্তরঞ্জিত শার্টই শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারের পতনের মানচিত্রে পরিণত হয়েছিল।
তবে রায়ের পর আজ বড় প্রশ্ন এই রায় কি ন্যায়বিচারের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছে?
দণ্ডের ব্যবচ্ছেদ ও গণঅসন্তোষ:
প্রকাশিত রায়ে দুই পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড, তিনজনকে যাবজ্জীবন ও ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হলেও জনমনে অস্বস্তি কাটছে না। বিশেষ করে আবু সাইদকে লাঠিচার্জ ও নির্মম শারীরিক নির্যাতন করা ছাত্রলীগ নেতা পোমেল বড়ুয়ার ১০ বছরের সাজা নিয়ে খোদ শহীদের পরিবার ও সহপাঠীরা ক্ষুব্ধ। গুরু অপরাধে ছাত্রলীগ নেতার এমন লঘুদণ্ড জনমনে যথেষ্ট প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। যখন একজন ঘাতকের নির্মমতা স্পষ্ট, তখন এমন লঘু দণ্ড বিচারিক প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। শহীদের পিতা মকবুল হোসেনের কান্নাসিক্ত কণ্ঠে যখন ‘অসন্তোষ’ ঝরে পড়ে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে, এই রায় আইনি প্রক্রিয়া পূর্ণ করলেও ‘ইনসাফ’ বা সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হোঁচট খেয়েছে।
হুকুমদাতা বনাম আজ্ঞাবহ সিস্টেমের পুরনো ক্ষত:
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এটি ছিল একটি ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’। প্রশ্ন ওঠে এই পরিকল্পনার মাস্টারমাইন্ড কারা? মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আমির হোসেন এবং সুজন চন্দ্র রায় যথাক্রমে এএসআই ও কনস্টেবল পদমর্যাদার। পুলিশি কাঠামোতে ১১ বা ১২তম গ্রেডের এএসআই এবং ১৭তম গ্রেডের কনস্টেবলের পক্ষে কি নিজ সিদ্ধান্তে এমন রাজনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা সম্ভব? তারা কি এমন রাজনৈতিক ও কৌশলগত খুনের মাস্টারমাইন্ড হতে পারে?
সাবেক এএসআই আমির হোসেনের শেষ উক্তিটি এ দেশের বিচারিক ইতিহাসের জন্য এক ট্র্যাজিক কৌতুক:
“আমি শুধু সরকারের হুকুম পালন করেছি… আমি সরকারের হুকুমের গোলাম। জয় বাংলা।”
তার এই স্বীকারোক্তিই বলে দেয়, অপরাধের শেকড় কত গভীরে। এই ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটিই প্রমাণ করে, হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কোন পর্যায় থেকে এসেছিল। এটাই এই মামলার রাজনৈতিক ও সামাজিক সত্য। যখন এএসপি, এসপি বা কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তারা নির্দেশ দেন, তখন মাঠপর্যায়ের সদস্যদের তা অমান্য করার সুযোগ সীমিত থাকে। অথচ রায়ে বড় কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি বা লঘু সাজার বিপরীতে ছোটদের বলির পাঁঠা করার প্রবণতা স্পষ্ট। বাস্তবতা হচ্ছে, বড়রা বাঁচে আর ছোটরা পুড়ে। আর এটাই আমাদের সিস্টেমের কঠোর সত্য।
এই রায়ের শিক্ষা ও আমাদের করণীয়:
১. হুকুমদাতাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা: ন্যায়বিচারের প্রধান শর্ত হলো অপরাধের উৎস খুঁজে বের করা। যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে ‘শুট টু কিল’ বা ‘বুক লক্ষ্য করে গুলি’ করার মৌখিক বা লিখিত নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাদের বিচারের বাইরে রেখে বিচারিক প্রক্রিয়া পূর্ণ হতে পারে না। রাষ্ট্রপক্ষকে অবিলম্বে উচ্চ আদালতে আপিল করে এই পরিকল্পনার মূল হোতাদের চিহ্নিত করতে হবে।
২. পুলিশ বাহিনীর কাঠামোগত সংস্কার: ‘হুকুমের গোলাম’ হওয়ার সংস্কৃতি থেকে পুলিশ বাহিনীকে বের করে আনতে হবে। কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অবৈধ বা অমানবিক নির্দেশ পালনে অস্বীকৃতি জানানোর আইনি সুরক্ষা কনস্টেবল থেকে শুরু করে নিচের সারির সদস্যদের দিতে হবে। অন্যথায়, ক্ষমতার পালাবদলে বারবার পুলিশ বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হবে।
৩. ছাত্রলীগ ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের বিচার: সহিংসতায় লিপ্ত রাজনৈতিক ক্যাডারদের শাস্তির ক্ষেত্রে কোনো নমনীয়তা দেখানো বিপ্লবের চেতনার পরিপন্থী। পোমেল বড়ুয়াসহ মাঠপর্যায়ের অন্যান্য নিপীড়কদের সাজার মাত্রা অপরাধের ভয়াবহতা অনুযায়ী পুনঃনির্ধারণ করা জরুরি।
পরিশেষে, শহীদ আবু সাইদ কেবল একটি নাম নয়, তিনি একটি নব্য বাংলাদেশের ইশতেহার। শহীদ আবু সাইদের রক্তরঞ্জিত রাজপথ আজন্ম সাক্ষী হয়ে থাকবে এক অসম যুদ্ধের। তার রক্তে কেনা এই স্বাধীনতায় যদি ‘অর্ধেক সত্য’ বা ‘অর্ধেক বিচার’ প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তা হবে শহীদদের আত্মার সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। ন্যায়বিচার যেন কেবল নিম্নপদের কর্মচারীদের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে ওপরতলার অপরাধীদের আড়াল করার হাতিয়ার না হয়। আবু সাইদের পরিবার ও দেশবাসী এমন এক বিচার দেখতে চায়, যেখানে অপরাধী যে স্তরেরই হোক—তার দণ্ড হবে প্রশ্নাতীত এবং সমানুপাতিক। ইতিহাসের পাতায় এই রায় যেন কেবল একটি নথিপত্র হয়ে না থাকে, বরং আগামীর বাংলাদেশের জন্য এক নির্ভীক ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থার উদাহরণ হয়ে ওঠে।