স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অধিকারের সুরক্ষাসংক্রান্ত আইন বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেছেন,
বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকার যেভাবে একের পর এক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তাতে স্পষ্টভাবে মনে হচ্ছে তারা অতীত থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি। তার এই মন্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক ও নীতিগত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার ৯ এপ্রিল বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে মানবাধিকার সুরক্ষা ও স্বাধীন বিচার বিভাগ সম্পর্কিত অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে নাগরিক ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় দেশের আইন ও শাসনব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে প্রণীত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ রহিত করার সিদ্ধান্ত বোধগম্য নয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন বিএনপি এই পদক্ষেপ নিল এবং এর পেছনে কী যুক্তি রয়েছে। তার মতে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পরিবর্তে এই ধরনের সিদ্ধান্ত উল্টো সেই স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
অতীতের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, উচ্চ আদালতে গিয়ে বিএনপির হাজার হাজার নেতা কর্মীকে জামিনের জন্য ধরনা দিতে হয়েছে। অনেকেই নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হলেও ন্যায়বিচার পাননি। সেই অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান বিএনপি সরকার একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, অতীতের কষ্টকর অভিজ্ঞতা থেকেও যদি শিক্ষা নেওয়া না হয়, তবে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি অনিবার্য হয়ে ওঠে।
স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টিও তিনি কঠোরভাবে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এটি সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদসহ বিভিন্ন আইনি কাঠামোর লঙ্ঘন। তার মতে, ক্ষমতায় থাকা যে কোনো দলের উচিত এমন আইন প্রণয়ন করা, যা তারা বিরোধী দলে গেলে নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু বিএনপি সরকার সেই পথ অনুসরণ না করে উল্টো পথে হাঁটছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ধরনের সিদ্ধান্তের পরিণতি শুভ হবে না। এতে নাগরিকদের অধিকার যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তেমনি ক্ষমতাসীনদের জন্যও তা দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তিনি বলেন, আমি শঙ্কিত, কারণ এর প্রভাব শুধু বর্তমানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ভবিষ্যতেও এর প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে অনীহা এবং স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অধিকারের সুরক্ষাসংক্রান্ত আইন বাতিলের কারণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, দুই তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেক সময় অভিশাপে পরিণত হয়—বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসেও তার উদাহরণ রয়েছে। ১৯৭৩ সালের নির্বাচন, ২০০১ সালের নির্বাচন কিংবা ২০০৮ সালের পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি ইঙ্গিত দেন, একক ক্ষমতার অপব্যবহার শেষ পর্যন্ত স্বৈরতন্ত্রের পথ খুলে দিতে পারে।
তার মতে, বর্তমান সংসদের সদস্য এবং যারা সরকার পরিচালনা করছেন, তাদের এখনই এসব সিদ্ধান্তের পরিণতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন। অন্যথায় একই ভুলের পুনরাবৃত্তি দেশের গণতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকারের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে।