বঙ্গভবনে মব পরিস্থিতির সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়ে তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে ফোন করেছিলেন। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ দাবিতে বিভিন্ন সংগঠনের ডাকে সেদিন আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছিল।
গত শুক্রবার রাতে বঙ্গভবনে নিজ কার্যালয়ে একান্ত সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবরের সেই রাতের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, দিনটি ছিল জীবনের অন্যতম বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা।
রাষ্ট্রপতি বলেন, শুরুতে তিনি বুঝতে পারছিলেন না কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন মহল থেকে নানা গুঞ্জন ভেসে আসছিল। রাত প্রায় ১২টার দিকে নাহিদ ইসলাম ফোন করে জানান, ‘এরকম একটি খবর পেয়েছি, ওরা আমাদের লোক নয়। আমি এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেছি। এগুলো সব আমরা ডিসপার্স করার চেষ্টা করছি।’
এর কিছুক্ষণ পর কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি এসে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশকে সরিয়ে নেয়। তবে সবাই সরে যায়নি। একটি অংশ অবস্থান ধরে রাখে এবং পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাত দুইটা পর্যন্ত সময় লাগে।
রাত দুইটা থেকে তিনটা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ও বঙ্গভবনের ভেতরে থাকা অন্যরা জেগে ছিলেন। বাইরে তখনও ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে বৈঠক চলছিল। রাজধানীর রাজু ভাস্কর্য এলাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পয়েন্টে ‘রাষ্ট্রপতির অপসারণ চাই’ স্লোগান শোনা যায়।
ঘটনার পটভূমি তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ২২ অক্টোবর হঠাৎ করেই বঙ্গভবন ঘেরাও করা হয়। বিভিন্ন নামের ব্যানারে-কখনো অমুক দল, তমুক দল, ইনকিলাব মঞ্চ বা জুলাই ঐক্য-নানা নামে রাতারাতি গড়ে ওঠা প্ল্যাটফর্মের অধীনে একই ধরনের লোকজন রাস্তায় নামে।
ঘেরাও শুরুর পরপরই সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের সদস্যরা এসে বঙ্গভবন ঘিরে তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলে। এই সময় একটি ঘটনা রাষ্ট্রপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এক তরুণী কাঁটাতারের বেড়ার ওপর উঠে লাফ দেন। রাষ্ট্রপতির দাবি, পুরো ঘটনাটি পরিকল্পিত ও ভাড়াটিয়া চরিত্রের ছিল। সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের পর ওই তরুণী মাটিতে পড়ে থেকে ক্যামেরাম্যানকে ছবি তুলতে আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতির মতে, উদ্দেশ্য ছিল সেই ছবি ব্যবহার করে পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন ও চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা। পরে নারী পুলিশ ও নারী সেনাসদস্যরা তাকে সরিয়ে নেয়।
রাষ্ট্রপতির বলেন, রাতটি শুধু নিরাপত্তার দিক থেকেই নয়, মানসিকভাবেও ছিল অত্যন্ত চাপের। ফ্লাইওভার দিয়ে ঠেলাগাড়ি, ভ্যান ও কাভার্ডভ্যানে করে বিভিন্ন স্থান থেকে ছিন্নমূল মানুষ আসছিল। আশঙ্কা ছিল, ৫ আগস্ট যেভাবে গণভবনে লুটপাট হয়েছিল, তেমন ঘটনা বঙ্গভবনেও ঘটতে পারে। তবে তিনি বলেন, তিনি পালিয়ে যাওয়ার মানুষ নন এবং সারা সময় বঙ্গভবনের ভেতরেই ছিলেন।
শেষ পর্যন্ত তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় ও সেনাবাহিনীর কঠোর অবস্থানের ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। রাষ্ট্রপতির দাবি, এপিসি ব্যবহার করে সেনাসদস্যরা ধীরে ধীরে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেয় এবং বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়।